
ইরান আর কতদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে?
দৈনিক সময়ধারা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত ছয় মাসের কাছাকাছি পৌঁছেছে। দীর্ঘ এই যুদ্ধে ইরানের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতি, জ্বালানি খাত ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। তবু এখন পর্যন্ত তেহরানের অবস্থানে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার মতো দৃশ্যমান কোনো তাগিদ দেখা যাচ্ছে না।
বরং ইরানের কৌশল দেখে মনে হচ্ছে, তারা শুধু সামরিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে তেহরান। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরানের অবস্থান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ
ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই সংকট আরও গভীর হয়েছে। তেলের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিতে রপ্তানি কমে যাওয়া, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনৈতিক ক্ষতি দ্রুত বাড়ছে। তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয়েও চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে।
তবে অর্থনৈতিক সংকট মানেই যে ইরান দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে তেহরান ইতোমধ্যে একটি চাপ-সহনশীল অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে। বিকল্প বাণিজ্যপথ, সীমিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রির বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
যুদ্ধের কৌশল বদলাতে পারে তেহরান
ইরানের জন্য এই যুদ্ধের বড় প্রশ্ন শুধু কতদিন লড়াই করা সম্ভব, তা নয়; বরং কতটা কম খরচে যুদ্ধ চালিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপের মধ্যে রাখা সম্ভব—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তেহরান যদি সরাসরি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পরিবর্তে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, আঞ্চলিক মিত্র এবং হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে তুলনামূলক কম সম্পদ ব্যয় করেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ বজায় রাখা সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের ওপর সামরিক হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মতো পদক্ষেপ জোরদার করছে। ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
তাহলে কতদিন যুদ্ধ চলতে পারে?
এর নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনই বলা কঠিন। কারণ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা শুধু অস্ত্র ও অর্থের ওপর নির্ভর করে না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জনগণের সহনশীলতা, তেলের আয়, সামরিক সরঞ্জামের মজুত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপরও বিষয়টি নির্ভর করবে।
ইরানের অর্থনীতি যত দুর্বল হবে, যুদ্ধ চালানোর খরচ তত বেশি অনুভূত হবে। কিন্তু একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য বাড়ছে। ফলে সংঘাতের ভবিষ্যৎ শুধু ইরানের সক্ষমতার ওপর নয়, বরং দুই পক্ষের মধ্যে কে কতদিন বেশি চাপ সহ্য করতে পারে—তার ওপরও নির্ভর করছে।
বিশেষজ্ঞদের জন্য সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা এখানেই। ইরান হয়তো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কিন্তু সেই ক্ষতি এখনও দেশটির নেতৃত্বকে তাদের কৌশল পুরোপুরি বদলাতে বাধ্য করেনি। অন্যদিকে দীর্ঘ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব বাড়ছে।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাবনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হওয়া, নতুন কোনো মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো অথবা সামরিক সংঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠা।
ইরান যদি অর্থনৈতিক চাপ সামলে সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার তেল রপ্তানি, অবকাঠামো ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাপ এমন পর্যায়ে পৌঁছালে তেহরানও সমঝোতার পথে যেতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় বড় অগ্রগতি হয়নি। ফলে যুদ্ধের শেষ কোথায় এবং ইরান ঠিক কতদিন এই চাপ সহ্য করতে পারবে—এর উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান হয়তো দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে না চাইলেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা সহ্য করতে পারবে, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাদের কৌশলের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।