
হামাস কি সত্যিই শেষ? গাজার ধ্বংসস্তূপেও কেন টিকে আছে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব
গাজায় দীর্ঘ সংঘাত হামাসকে যে বড় ধরনের সামরিক ও সাংগঠনিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে, তা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক নেই। সংগঠনটির বহু গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিহত হয়েছেন, সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং গাজার মানুষের জীবনযাত্রা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। একই সঙ্গে হামাসের নেতৃত্ব ও কর্মকাণ্ড নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ।
তবে এসব বাস্তবতা থেকে সরাসরি বলা যায় কি—হামাসের রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ?
উত্তরটি এতটা সরল নয়।
সামরিক দুর্বলতা কি রাজনৈতিক পরাজয়?
একটি সংগঠন সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেই যে তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায়, ইতিহাসে তার বহু উদাহরণ রয়েছে। কোনো আন্দোলনের শক্তি শুধু অস্ত্র, যোদ্ধা কিংবা ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে না। জনগণের একটি অংশের মধ্যে থাকা রাজনৈতিক প্রভাব, দীর্ঘদিনের সংগঠন, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
এই দিক থেকে দেখলে হামাস নিঃসন্দেহে আগের অবস্থানে নেই। ৭ অক্টোবরের আগের তুলনায় তাদের সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত। গাজা পরিচালনার মতো প্রশাসনিক ক্ষমতাও আগের পর্যায়ে নেই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—তাদের জায়গা পূরণ করার মতো বিকল্প শক্তি কি তৈরি হয়েছে?
সেখানেই বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে।
গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে হামাসকে বাদ দেওয়া কতটা সম্ভব?
যুদ্ধবিরতি, বন্দী বিনিময়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা পরিচালনার পরিকল্পনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই হামাসকে ঘিরে কোনো না কোনো আলোচনা তৈরি হচ্ছে।
এর অর্থ এই নয় যে হামাস আগের মতো শক্তিশালী। বরং এর অর্থ হলো, গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সংগঠনটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা এখনও সহজ নয়।
একটি রাজনৈতিক শক্তি সরকারে না থেকেও প্রভাবশালী হতে পারে। কখনো কখনো কোনো পক্ষকে আলোচনার বাইরে রাখার চেষ্টা করাই বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও কঠিন করে তোলে।
হামাসের ক্ষেত্রেও এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের অনেকে।
মানুষের ক্ষোভও বাস্তব
তবে হামাসের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে গাজার সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
দীর্ঘ যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও পানির সংকট, চিকিৎসাব্যবস্থার বিপর্যয় এবং নিরাপত্তাহীনতা মানুষের জীবনকে বিপন্ন করেছে। স্বাভাবিকভাবেই অনেক গাজাবাসী যুদ্ধ ও নিজেদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
কেউ হামাসের সমালোচনা করছেন বলেই তিনি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে—এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়।
একইভাবে যুদ্ধের অবসান চাওয়া মানেই কোনো জনগোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক অধিকার কিংবা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করেছে—এমনটিও ধরে নেওয়া যায় না।
মানুষ একই সঙ্গে যুদ্ধের বিরোধিতা করতে পারে, হামাসের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে পারে এবং ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক অধিকারকেও সমর্থন করতে পারে।
ইসরায়েলের অবস্থানও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত
হামাস শেষ হয়ে গেছে—এমন ধারণার বিপরীতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসরায়েলের নিজস্ব অবস্থান।
যদি হামাস পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যেত, তাহলে তাদের অস্ত্র, সাংগঠনিক কাঠামো, ভবিষ্যৎ ভূমিকা এবং গাজায় ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে এত গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন হতো না।
কিন্তু বাস্তবে হামাসের অস্ত্র সমর্পণ, তাদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস এবং ভবিষ্যতে সংগঠনটির ভূমিকা ঠেকানোর বিষয়গুলো এখনও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
এতে অন্তত এটুকু বোঝা যায়—হামাসকে পুরোপুরি অতীতের বিষয় হিসেবে দেখার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি।
আসল লড়াই হয়তো যুদ্ধের পর
গাজার যুদ্ধ শেষ হলেও সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো তখনই সামনে আসতে পারে।
গাজা কে পরিচালনা করবে?
নিরাপত্তার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে?
ফিলিস্তিনি জনগণের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে?
গাজার পুনর্গঠন কীভাবে হবে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো বাস্তব রাজনৈতিক পথ তৈরি হবে কি না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত শুধু সামরিক শক্তি কমে যাওয়ার ভিত্তিতে হামাসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন।
তাহলে হামাসের সামনে কী?
বাস্তবতা হলো, হামাস আগের অবস্থায় নেই। যুদ্ধ তাদের সংগঠন, সামরিক সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে বড় আঘাত করেছে। ভবিষ্যতে তারা আগের মতো গাজা পরিচালনা করতে পারবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, হামাসকে সরিয়ে দেওয়ার পর তার জায়গায় কোন শক্তি কার্যকরভাবে দায়িত্ব নেবে—এ প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর এখনও নেই।
সুতরাং হামাসের ভবিষ্যৎ হয়তো আগের মতো হবে না। সংগঠনটি হয়তো সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল একটি কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকায় যেতে পারে। অথবা গাজার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের প্রভাব আরও সীমিত হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু আজকের বাস্তবতায় একটি বিষয় স্পষ্ট—হামাস দুর্বল হয়েছে, কিন্তু শেষ হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনও আসেনি।
গাজার ভবিষ্যৎ, ফিলিস্তিনি রাজনীতি এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ক্ষমতার সমীকরণই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে হামাস ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে, নাকি নতুন কোনো রাজনৈতিক রূপে আবারও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।